• ৪ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বলিভিয়ার শিক্ষা : শক্তিশালী দল ও গণভিত্তিই মূল কথা

0

মামুন ফরাজীঃ চক্রান্তের পর চক্রান্ত, তার পরেও বলিভিয়ার বামপন্থীদের ঠেকানো গেল না। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার দোসরদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের নেতৃত্বাধীন মুভমেন্ট টুওয়ার্ডস সোশ্যালিজম (ম্যাস) ভ‚মিধ্বস জয় পেয়েছে। এই দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী লুইস আর্কে ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দক্ষিণপন্থী জোটের প্রার্থী কার্লোস মেসাকে হারিয়েছেন। মেসা পেয়েছেন মাত্র ২৮.৮ শতাংশ ভোট। শুধু তাই নয়, হাউজ অব কংগ্রেসেও ‘ম্যাস’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সুপ্রিম ইলেকশন ট্রাইব্যুনাল ২৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের চ‚ড়ান্ত ফল ঘোষণা করে। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের প্রধান সালভাদোর রোমেরো ফল ঘোষণার সময় বলেন,“করোনা সত্তে¡ও ৮৮.৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকায় ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ ‘টার্ন আউট’।”
পর্যবেক্ষদের মতে, এটা শুধু লুইস আর্কের একক বিজয় নয়, এই বিজয় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের বিজয়। সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক বিশ্বমোড়লদের বিরুেেদ্ধ বলিভিয়ার জনগণের অভ্যুত্থানও বটে।  গত বছর নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চতুর্থবারে মতো বিজয়ী হয়েছিল ইভো মোরালেসের দল। ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে রাজপথে নামে সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেসার সমর্থকরা। এর আগে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি বলে মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট রাজপথ উত্তপ্ত করার মঞ্চ প্রস্তুত করে দেয়। মার্কিন ইশারায় ডানপন্থীরা মোরালেসের সমর্থক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করে। মোরালেস নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তারা। কার্লোস মেসার সমর্থকদের সাজানো আন্দোলনের মুখে বলিভিয়ার সামরিক ও পুলিশ বাহিনীও ইভো মোরালেসের পেছন থেকে সরে যায়। এর সঙ্গে যোগ দেয় তথাকথিত সুশীল সমাজ। এরপর মোরালেসকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। মোরালেস দেশ ছাড়ার পরপরই বিরোধীরা সেনাবাহিনীর সহায়তায় অন্তবর্তী সরকার গঠন করে। তবে এই অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন মোরালেসের সমর্থক তথা বামপন্থীরা। হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক রাজপথে নেমে আসে। তাদের ধর্মঘট ও অবরোধে অচল হয়ে পড়ে গোটা দেশ। ক্ষমতা দখলকারীরা সেনাবাহিনী-পুলিশ ও তাদের পান্ডাদের নামিয়ে দমন-পীড়ন চালায়। এক ডজনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু জনতাকে রাজপথ ছাড়া করতে পারেনি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে অন্তবর্তী সরকার নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিজীয়দের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রæতি দেয়। প্রতিশ্রæতি মেনে নিয়ে বামপন্থীরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এরই মধ্যে সাজানো নির্বাচন কমিশন ইভো মোরালেসের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে মুভমেন্ট টুওয়ার্ডস সোশ্যালিজমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক অর্থমন্ত্রী লুইস আর্কেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করা হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে আর্কেকে হারানোর জন্য নানা ফন্দি করে ক্ষমতা দখলকারীরা। মোরালেস ও তার দলের বিরুদ্ধে চালানো হয় নানা অপপ্রচার। কিন্তু  এরপরও ঠোকানো যায়নি আর্কেকে। কিন্তু বলিভিয়ার জনগণ আবার কেন মুভমেন্ট টুওয়ার্ডস সোশ্যালিজমকে বিজয়ী করলেন?এই পশ্নের উত্তর হলো-এক্ষেত্রে একক কোনো কারণ নেই। অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমত: সমসাময়িককালে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে বলিভিয়ার নিজস্ব অবস্থান তৈরি হয়েছিল ইভো মোরালেসের নেতৃত্বে। তিনি প্রবৃদ্ধিকে ৬ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিলেন। দেশজ উৎপাদন  তিনগুণ বাড়িয়েছিলেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করেছিলেন। দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলেন। বেকারত্ব কমিয়েছিলেন। জনসাধারণের ক্রমক্ষমতা বাড়িয়েছিলেন। খনিজ সম্পদকে জাতীয়করণ করে এর সুবিধা প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আদিবাসীদের ভ‚মির অধিকার নিশ্চিত করেছেন। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের পরামর্শ অনুসরণ না করে নিজস্ব পদ্ধতিতে অর্থনীতিকে পরিচালিত করেছেন। দেশের কৃষি ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও দুর্নীতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আর এর মধ্যদিয়েই মোরালেস জনগণের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। যার প্রমাণ মোরালেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ব্যাপক গণবিক্ষোভ। দ্বিতীয়ত : মোরালেস বিশ্ব গণমাধ্যমে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত। ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট (প্রয়াত) হুগো স্যাভেজের সঙ্গে জোট বেঁধে দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিনবিরোধী বলয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ফকল্যান্ড দ্বীপের ওপর আর্জেন্টিনার দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন মোরালেস। এসব কারণে দক্ষিণ আমেরিকার মার্কিনবিরোধী দেশগুলো থেকে নৈতিক সমর্থন পেয়ে যাচ্ছেন মোরালেস ও তার দল। তৃতীত: মোরালেস বিদেশে বসে বসে সময় কাটাচ্ছেন না। আর্জেন্টিায় অবস্থান করে তিনি দল পরিচালনা ও নির্বাচন পরিচালনার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বার বারই গণমাধ্যমকে বলেছেন, জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। নির্বাচন সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ হলে আমরাই জয়ী হবো। চতুর্থ : লুইস আর্কে মোরালেস সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এ সময় তার নেয়া কিছু পদক্ষেপ বলিভিয়ার অর্থনীতিতে ব্যাপক সুফল বয়ে আনে। আর মোরালেস ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আর্কে দল পরিচালনার ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এসব কারণেই দলের নেতাকর্মী তথা দেশটির জনগণ তার ওপর আস্থা রেখেছেন। রাজনৈতিক পর্যক্ষেকদের মতে, লুইস আর্কে সরকার চালালেও দল পরিচালনা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসবে মোরালেস কাছ থেকেই। আর্কে মোরালেসের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এই দু’জনের বোঝাপড়াও ভাল। সব মিলে দুইজনের চেষ্টায় বলিভিয়া আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। ফল ঘোষণার পর আর্কে দেশ পূর্ণগঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে জনগণের জন্য সুন্দর আগামী তৈরি করা। মানুষ আমাদের ওপর যে বিশ্বাস রেখেছে তা আমরা হারাতে দেব না।’
শেষ কথা : এই নির্বাচনের একটি বর্তা হচ্ছে-গণভিত্তি থাকলে বাইরের শক্তির সহায়তায় জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায় না। জনপ্রিয় শাসকদের জেলে পুরে, নির্বাসনে পাঠিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য দৃশ্যপট থেকে দূরে রাখা গেলেও জনগণের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।

Share.

Leave A Reply