দেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রে উত্তরণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এখন সময়ের দাবী। দেশের শান্তি শৃঙ্খলা, আইনের শাসন, সর্বোপরি স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণকে নির্বাচনী ব্যবস্থায় অংশীজন করে তুলতে হবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্ধারন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তি পূর্ণ, সকল দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা প্রদানসহ সকল রকম প্রভাব মুক্ত থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
এদেশে নির্বাচনকে ঘিরে বার বার বির্তক সৃষ্টি হয়। শাসন ক্ষমতায় যারা থাকেন নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অধীনস্থ করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের নানান ব্যাতয় ঘটান। আমাদের সংবিধানুসারে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও নানান কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা যখন পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে তখনই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সচল, গতিশীল ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দেশের চরম ক্রান্তিলগ্নে দেশ বাঁচানোর স্বার্থে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার তথা ভোটাধিকার সুরক্ষিত করার সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে।
মাননীয় নির্বাচন কমিশন সচিবের সংগে আমাদের এই মতবিনিময় সভা থেকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি কতিপয় প্রস্তাব তুলে ধরছে, আশা করি নির্বাচন কমিশন জাতির স্বার্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সার্ব্বিক জনগণের মঙ্গলার্থে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিবেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং লাখো মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের মাতৃভূমির সন্তানের সুখ সমৃদ্ধির মধ্যদিয়ে তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে নিবেন।
মতবিনিময় সভায় ওয়ার্কার্স পার্টি ১০ দফা প্রস্তাব-
১। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন:
ক) ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে এর কোন বিকল্প নাই। তবে অবস্থিত সরকার যাতে নির্বাচনের সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটাতে না পারে
তার জন্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকার দৈনন্দিন কাৰ্য্যাবলী ছাড়া নীতিগত বা উন্নয়নমূলক কোন কাজ করতে পারবেনা। উন্নয়নসহ কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেনা। সরকারী কর্মকান্ডে ক্ষমতাসীন সরকারের উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ নিরাপত্তা ছাড়া বাকী সব প্রোটকল সুবিধা স্থগিত থাকবে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয় নিশ্চিত করবেন।
খ) নির্বাচনকালীন সময় স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্বাচকালীন সম্পর্কিত কাজের জন্য নির্বাচন কমিশনের অধীন ন্যস্ত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পূর্বে তিনমাস ও পরের তিনমাস নির্বাচনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বদলী, পদোন্নতি, কর্তব্যে অবহেলার জন্য শান্তি প্রদানের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ হিসাবে কাজ করবে। এর জন্য সংবিধানের সংশোধনের কোন প্রয়োজন পরবেনা।
২। ভোটার তালিকা: নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন ও সংযোজনের যে ব্যবস্থা সময় সময় নিয়ে থাকে তা যথোপযুক্ত হয়না বলে জনমনে ধারণা। এ ক্ষেত্রে এনআইডি ও তার সংশোধন নিয়ে বহু বিভ্রান্তি ও হয়রানী আছে। এসব দুর করতে ভোটার তালিকা কেবল প্রকাশ্যে টাঙ্গিয়ে দেয়াই যথেষ্ট হবে না, এখন প্রযুক্তির উন্নতির পর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের সংশোধন-সংযোজনের সুযোগ দিতে হবে।
ক) মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা বাদ দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের এনআইডি প্রদান ও ভোটার তালিকা অন্তর্ভুক্ত করার সাথে জড়িত কর্মকর্তা, কর্মচারী, সুপারিশকারী জনপ্রতিনিধিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।
খ) ইতোমধ্যেই প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা সুনিশ্চিয়তা করতে হবে।
গ) পার্বত্য অঞ্চলে পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ভোটার তালিকা প্রণয়ন করতে হবে।
৩। নির্বাচনী সীমানা পুর্ননিধারণ:
নির্বাচনী সীমানা পুর্ননিধারণে কোন এলাকা ডিসপিউট থাকলে তফসিল ঘোষনার আগেই সমাধান করতে হবে।
৪। নির্বাচনে টাকার খরচ নিয়ন্ত্রণ করা:
ওয়ার্কার্স পার্টি প্রতিটি নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচনে টাকার খেলা নিয়ন্ত্রণের দাবী জানিয়ে এব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পক্ষান্তরে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়িয়ে চলেছে এবং নির্বাচনী খরচ নিয়ন্ত্রণে আগে ও পরে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।
ক) ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে নির্বাচনী ব্যয়সীমা যুক্তিসঙ্গতভাবে কমিয়ে আনতে পোস্টার, লিফলেট, ডিজিটাল প্রচার, রেডিও-টেলিভিশনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রনের জন্য এ ব্যাপারে আরপিও ও নির্বাচনী আচরণবিধিতে সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। এর প্রতিটি বিষয় পর্যাবেক্ষণ ও নির্বাচন কমিশানকে রিপোর্ট প্রকাশের জন্য কর্মকর্তা নির্দিষ্ট করে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। এবং নির্বাচন চলাকালীন সময়েই তাদের পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রার্থী বা তার প্রধান এজেন্টকে শুনানী করে নির্বাচন বাতিলসহ শান্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
খ) প্রার্থী বা তার হয়ে যে কেউই খরচ করুক না কেন সেটা প্রার্থীর ব্যয় হিসাবে গণ্য হবে এবং তা কোনক্রমে নির্বাচনী ব্যয় সীমা অতিক্রম করবেনা।
গ) প্রতি নির্বাচনী এলাকায় একজন নির্ধারিত কর্মকর্তা প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় মনিটর করবেন ও নির্বাচন কমিশনকে নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করবেন। এই রিপোর্টের সাথে প্রার্থীর দেয়া নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী মিলিয়ে দেখা হবে।
ঘ) প্রার্থীর নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের বিবরণ সর্বসাধারণকে জ্ঞাত করার জন্য উন্মুক্ত দলিল হিসাবে রাখতে হবে এবং গণমাধ্যমসহ যে কেউ তা সংগ্রহ করতে পারবে।
ঙ) নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের হিসাবে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে এবং ঐ হিসাব না দেয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সদস্যের শপথ গ্রহণ স্থগিত থাকবে।
চ) নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ব্যয় মেটাতে নির্বাচনী এলাকা ভোটার সংখ্যা অনুসারে পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, মার্কা সম্বলিত হ্যান্ডবিল, তিনকপি ভোটার তালিকা (সিডিসহ) সরবরাহ করবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে নির্বাচন ম্যানিফেস্টোর ও মার্কা প্রচারের ব্যবস্থা করবে।
৫। নির্বাচনকে সন্ত্রাস পেশী শক্তির প্রভাব ও দুর্বত্তমুক্ত করতে-
(ক) নির্বাচনে সকল প্রকার বল প্রয়োগ, অস্ত্র বহণ ও প্রদর্শন পরিপূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং বল প্রয়োগের ঘটনার কঠোর শান্তিবিধান করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের নিরাপত্তা বিধানসহ নির্বাচনী প্রচার কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
(খ) মিথ্যায় মামলায় আটককৃত জাতীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ৫বার নির্বাচিত সাংসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ ওয়ার্কার্স পার্টির অন্যান্য নেতাদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নির্বাচনের অংশগ্রহণের অবারিত সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. এবারে বিশেষ বাস্তবতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে করার কথা বলা হচ্ছে। এ ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের ভোট প্রক্রিয়ায় যেমন সময় লাগবে তেমন ভোটার বিভ্রান্ত হবে। সেই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পূর্ণ করে পরবর্তীতে গণভোট করা যেতে পারে।
৭. নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার
-নির্বাচনে ধর্মের সর্বপ্রকার ব্যবহার, সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা ও ভোট চাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ করতে হবে। সকল প্রকার ভয়ভীত্তি ও মবসন্ত্রাস বন্ধের করতে হবে।
-ধর্মীয় উপসনালয়, মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, মঠ, ওয়াজ ধর্মসভায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচার, করা যাবে না। পোষ্টার, হ্যান্ডবিল বিলি নিষিদ্ধ করতে হবে।
৮. রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন
আরপিও ৯০ (সি) ধারায় ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন না দেয়ার সুনির্দিষ্ট কোন বিধান নেই। দলে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যকরণ এবং রাজনৈতিক দলের নাম, পতাকা, প্রতীকের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট হতে পারে এমন দলের নিবন্ধন না দেয়ার যে বিধান এ বিধির (ধ), (ন) ও (প) উপবিধিতে রাখা হয়েছে বস্তুত তার কোন কার্যকারিতা নেই। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিরোধী ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দলসমূহ নিবন্ধন না দেয়ার জন্য ওয়ার্কার্স পার্টি সব সময় প্রস্তাব করেছে। সংবিধানের ধারা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ধারায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও ধর্মকে ব্যবহারকারী কোন দলকে নিবন্ধন না দেয়ার বিষয় নির্বাচনী আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৯. নির্বাচনে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা
-পোষ্টার, লিফলেট, বৈদ্যুতিক, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবহার, মাইক, নির্বাচন ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন, গেইট নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে যে সব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আছে তা ব্যতিক্রমহীনভাবে পালন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তা এই বিষয়ে নিশ্চিত করবেন। এবং এ ক্ষেত্রে কোন আইন ও বিধি ভাঙ্গা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করবেন।
-নির্বাচন কমিশন প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় Projection সভার আয়োজন করবে
-নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে সকল দলের কেন্দ্রীয় সমাবেশ, মহাসমাবেশ, র্যালী, জনসভার ব্যায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
-নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্বাচনী অফিস ব্যতিরেকে কোন নির্বাচনী ক্লাব, ক্যাম্প নির্বাচনী প্রচার কেন্দ্র হিসেবে কোন কাঠামো তৈরি করা যাবে না।
-রেডিও টিভির সময় সমভাবে বণ্টন করা এবং তার ব্যায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
এসব প্রতিটি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং লংঘনকারীদের প্রার্থীতা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০) যেহেতু অর্ন্তভুক্তিকালীন সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে- নির্বাচনী মাঠে আইনশৃংখলা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ ব্যবহার এবং সেনা বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর সুষম সমন্বয় থাকতে হবে। সেনা বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিতে হবে।
পরিশেষে ওয়ার্কার্স পার্টি একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ, অর্ন্তভুক্তিমূলক ও অংশগ্রণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।